3.11.18
শুক্রবার রাতে গণভবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল ও বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। রাত পৌনে ৮টায় সংলাপ শুরু হয়ে শেষ হয় পৌনে ১১টায়। তিন ঘণ্টার এ সংলাপকে উভয় পক্ষই ফলপ্রসূ বলেছে।
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ সংলাপকে ঘিরে আগ্রহ দেশি বিদেশি সব গণমাধ্যমের। সারা বিশ্বের চোখ যেন গণভবনে। যার কারণে গণমাধ্যম কর্মীরাও খুটিয়ে খুটিয়ে এ সংলাপের ভেতরকার সব খবর দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের খাবারের ছবিও বাদ যায়নি।
আগ্রহের যায়গা থেকে দ্বিতীয় দিনের সংলাপে গণমাধ্যম কর্মীদের চোখে পড়ে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে সদ্য বিকল্পধারায় যোগ দেয়া শমসের মুবিন চৌধুরীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত কথোপকথন। সবাইকে বসতে বলে নিজ আসন থেকে এগিয়ে গিয়ে শমসের মুবিন চৌধুরীর সঙ্গে কী কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী? এমন কৌতূহল সবারই।
ঘটনার সূত্রপাত এভাবে— বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের নেতারা সংলাপের জন্য প্রস্তুত। ১৪ দলের নেতারাও আসন গ্রহণ করেছেন। ঘড়ির কাটায় ৭টা ৪০ কী ৪২ মিনিট হবে। এমন সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপস্থল ব্যাঙ্কোয়েট হলে প্রবেশ করলেন। সবাই দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান।
পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বি চৌধুরী ও মেজর (অব.) মান্নানসহ যুক্তফ্রন্টের নেতারা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। পরে সংক্ষিপ্ত ও অনানুষ্ঠানিক কুশলাদি বিনিময় হয়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সকলকে বসতে বলেন। বি চৌধুরী বলেন, ‘আপনি প্রধানমন্ত্রী, আপনি আগে বসেন।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আজ প্রধানমন্ত্রী না, হোস্ট।’
তখন সবাই বসছিলেন। এসময় নিজের দাঁড়ানো যায়গা থেকে একটু এগিয়ে শমসের মুবিন চৌধুরীর সামনে যান শেখ হাসিনা। তার সামনে দাঁড়িয়ে ৫০ সেকেন্ড কথা বলেন।
কথার মাঝে প্রধানমন্ত্রীকে ‘জানতাম না তো’ এমন ভঙ্গি করতে দেখা গেছে। এক পর্যায়ে লিখে দেয়ার জন্য হাতে ইশারা করেন।
যদিও প্রধানমন্ত্রী ও শমসের মুবিন চৌধুরীর কথোপকথনে কী ছিল তা জানা যায়নি। তবে কথোপকথনে মনে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য শেয়ারিং এবং খোঁজখবর দেয়া-নেয়া হয়েছে।
এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ৪৪ মিনিটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের সংলাপ শুরু হয়।
সংলাপে ১৪ দলীয় জোটের ২৩ সদস্যের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপরীতে যুক্তফ্রন্টের ২১ সদস্যের নেতৃত্ব দেন জোট নেতা ও বিকল্পধারার চেয়ারম্যান ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
সংলাপে অংশ নিতে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বি. চৌধুরীরা গণভবনের ব্যাংকোয়েট হলে প্রবেশ করেন।
সংলাপে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের ২৩ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন, দলনেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, ড. আবদুর রাজ্জাক, কাজী জাফর উল্যাহ, রমেশ চন্দ্র সেন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, আবদুর রহমান, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও জাসদের একাংশের সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল।
আর যুক্তফ্রন্টের ২১ নেতা সংলাপে উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন, দলনেতা ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, প্রেসিডিয়াম সদস্য শমসের মবিন চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার মিলন, আবদুর রউফ মান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মুহম্মদ ইউসুফ, সহ-সভাপতি মিসেস মাহমুদা চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, সহ-সভাপতি মাহবুব আলী, সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি জেবেল রহমান গাণি, মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, বিএলডিপি সভাপতি নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, মহাসচিব অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন খান, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, জাতীয় জনতা পার্টির সভাপতি শেখ আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ জনদলের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জয় চৌধুরী, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ইউনাইটেড মাইনরিটি ফ্রন্টের চেয়ারম্যান দীলিপ কুমার দাস, লেবার পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদী, সাবেক এমপি মজহারুল হক শাহ চৌধুরী ও এনডিপি’র মহাসচিব মো. মাযহারুল হোসেইন ঈসা।
গত ৩১ অক্টোবর বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী সংলাপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দেন। এরপর গণভবনে তাদের শুক্রবার সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেয় আওয়ামী লীগ।
এরআগে বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সাথে সংলাপ করে ক্ষমতাসীন জোট। শুক্রবার বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ হলো। ৫ নভেম্বর জাতীয় পার্টি ও ৮ নভেম্বর বাম দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে ১৪ দল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে সংলাপে বসেছিলো ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। মূলত ঐক্যফ্রন্টের ৭ দাবি নিয়ে ওই আলোচনায় অংশ নেয় ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে কয়েকটি দাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেনে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীহ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
এর মধ্যে রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের তৃতীয় দফা। যেটি হচ্ছে বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক। ঐক্যফ্রন্ট যাতে সাভ সমাবেশ করতে পারে সে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই দিয়েছেন। তিনি বলেন, কেয়ারটেকার সরকারের সময় এই মামলাগুলো দেওয়া হয়েছিল। কেয়ারটেকার সরকারে যারা ছিল, তারা তো বিএনপির লোক ছিল। এ বিষয়ে আমাদের বলার বা করার কী আছে? এই মামলাগুলোর বিষয়ে আদালতেই ভালো বুঝবে।
ঐক্যফ্রন্টের ষষ্ঠ দাবি হলো, নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ভোট কেন্দ্র, পোলিং বুথ, ভোট গণনাস্থল ও কন্ট্রোল রুমে তাদের প্রবেশের ওপর ওপর কোনো ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ না করা এবং নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উপর যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে।
এ বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছে বলে জানান ওবায়দুল কাদের।
ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা
# অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
# গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
# বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
# কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।
# নির্বাচনের ১০ দিন পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্য্ন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।
# তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং নতুন কোনো মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
1.11.18
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংলাপের মাঝে আপ্যায়ন বিরতি হয়েছে গণভবনে। আপ্যায়নে অংশ নেবেন না বলে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা আগে জানালেও শেষ পর্যন্ত ভোজে অংশ নেন তারা। সব মিলিয়ে ১৮ ধরনের খাবারের ব্যবস্থা ছিল সেখানে।
আলোচনার মাঝপথে রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রধানমন্ত্রী খাওয়াদাওয়া শেষে আবার কথা শুরুর প্রস্তাব রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান ফেলতে পারেননিন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।
দেশের নামকরা হোটেল থেকে আনা ২০ বা ২১ পদের খাবারের তথ্য দুই দিন ধরেই গণমাধ্যমে আসছে। আর সংলাপের আলোচ্যসূচির চেয়ে খাবারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরুর পর বুধবার ঐক্যফ্রন্ট নেতারা জানান তারা খাবেন না।
তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় সংলাপের শুরুতেই অতিথিদের সামনে দেওয়া হয় কমলা লেবু, আপেল ও তরমুজের শরবত এবং চিপস। এরপর আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে খাবার সরবরাহ চলতে থাকে।
সংলাপে আওয়ামী লীগ এবং তার শরিক ১৪ দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দেন কামাল হোসেন।
গণভবনের কর্মীদের তথ্য এবং খাবারের একটি তালিকা থেকে দেখা যায়, খাবার তালিকায় ছিল মোরগ পোলাও, সাদা ভাত, বাটার নান, মাটন রেজালা, রুই মাছের দো পেঁয়াজা, চিতল মাছের কোপতা, রান্না করা মুরগির মাংস, গরুর মাংসের কাবাব, সুপ, নুডলস, মিক্সড ভেজিটেবল। ছিল কয়েক ধরনের সালাদ।
এ ছাড়া টক দই, মিষ্টি দই ও চিজ কেক ছিল ডেজার্ট হিসাবে। ছিল কোমল পানীয়, চা ও কফি।
এই খাবারের বেশির ভাগ খাবার আনা হয়েছে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল থেকে। চিজ কেক আনা হয়েছে হোটেল র্যা ডিসন থেকে। এটি ড. কামাল হোসেনের বেশ প্রিয় খাবার।
খাসির রেজালা আনা হয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে। মোরগ পোলাও রান্না করেন পিয়ারু বাবুর্চি।
গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী ড. কামালকে সংলাপের সময় জানিয়ে চিঠি দেয়ার সময়ই তার পছন্দের খাবারের কথা জেনে আসতে বলেছিলেন। আর ড. কামাল সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন রবিবার।
বৃহস্পতিবার ২১ ঐক্যফ্রন্টের নেতাকে নিয়ে গণভবনে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন কামাল হোসেন। তবে শেষ অবধি যাননি বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
এই প্রতিনিধি দলে কামাল হোসেনসহ গণফোরাম এবং বিএনপির ছয় জন করে নেতা, কামালের আরেক উদ্যোগ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দুই জন, জেএসডির তিন জন, নাগরিক ঐক্যের দুই জন এবং এদের বাইরে জাফরুল্লাহ চৌধুরীও যোগ দেন।
গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সংলাপে ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বিপরীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. কামাল হোসেন।
বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এ সংলাপ শুরু হয়।
এ সংলাপ শুরুর আগেই গণভবনের খাবারের মেন্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়। অবশ্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিনয়ের সঙ্গে নৈশভোজের খাবার প্রত্যাখ্যান করে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে সংলাপ করার জন্যে গণভবনের নৈশভোজ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
এ জন্য সংলাপের টেবিলে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের জন্য কোনো খাবার রাখা হয়নি, এমন নয়। তাদের সামনে রাখা হয়েছে, চিপস, বাদাম আর ফলের জুস। কথার ফাঁকে ফাঁকে এই তিন পদের খাবারে চলছে সংলাপ। ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের ৭/৮ নেতা বক্তব্য দিয়েছেন।
দেয়া হয়েছে ড. কামাল হোসেনের প্রিয় চিজ কেক। সেখান থেকে অংশ বিশেষ তাকে মুখেও নিতে দেখা গেছে।
সংলাপে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বাকিরা হলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, ড. আবদুর রাজ্জাক, কাজী জাফর উল্যাহ, রমেশ চন্দ্র সেন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, আবদুর রহমান, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও জাসদের একাংশের সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল।
আর জাতীয় ঐক্যজোটের বাকিরা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস ও ড. আব্দুল মঈন খান, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, কার্যকরি সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, মুকাব্বির খান, অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দায় আফ্রিক ও আ ও ম শফিকউল্লাহ, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন এবং রবের স্ত্রী ও সহ-সভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও তার দলের উপদেষ্টা এসএম আকরাম, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে সাবেক ছাত্রনেতা সুলতান মুহাম্মদ মনসুর ও আ ব ম মোস্তফা আমিন এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ।
কাদের সিদ্দিকীর বাসায়- এর আগে গত ২৫ অক্টোবর রাতে কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় গিয়ে তাকে দাওয়াত দিয়ে আসেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। সেদিন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংবিধান রচনা করেছেন।
এখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে। আমরা এখন একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’ তবে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া না দেওয়া নিয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি বলেও জানান তিনি।
কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর দাওয়াতে তার বাসায় ডিনারের জন্য গেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
এসময় কাদের সিদ্দিকীর বিষয়ে ড. কামাল বলেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ আদর্শগতভাবে সবসময়ই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আছে এবং থাকবে। ঐক্যফ্রন্টে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের অবস্থান কী হবে সে বিষয়ে ৩ নভেম্বর কাদের সিদ্দিকী ব্রিফ করবেন বলেও জানান গণফোরাম সভাপতি।
বুধবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কাদের সিদ্দিকীর বাসায় ড. কামালের সঙ্গে আরও অংশ নেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন।
সংলাপে আওয়ামী লীগের রাজি হওয়ার আসল কারন যা….
বৃহস্পতিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসতে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। নির্বাচনকালীন সরকারসহ ঐক্যফ্রন্টের সাত দফাসহ আরো নানা বিষয়ে আলাপ হবার কথা রয়েছে সেখানে।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপে বসার আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করার পর এখন কেন সংলাপে রাজি হয়েছে আওয়ামী লীগ?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টের কারণে সংলাপে রাজি হয়েছে তার দল।
“বিএনপির সাথে সরাসরি সংলাপে বসার ব্যপারে আওয়ামী লীগ আগ্রহ প্রকাশ করেনি। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যেহেতু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়া প্রশ্রয় দেয়া এবং এরপর ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকা—এসব কারণেই বিএনপির সাথে বসার মতো যৌক্তিক কোনো পরিবেশ ছিল না।”
“এখন যেহেতু ঐক্যফ্রন্ট একটা নতুন নেতৃত্ব এসেছে, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বসবে। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা করেই হয়তো আমার মনে হয় যে তারা যদি নির্বাচনে যায়, সে ব্যপারে আমাদের একটা পরামর্শ থাকবে বা আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে আসবে।”
বিশ্লেষকদেরও অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের এখন সংলাপে বসার বড় কারণই হচ্ছে, সংলাপটি সরাসরি বিএনপির সঙ্গে হচ্ছে না। বরং হচ্ছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি জোটের সঙ্গে।
তারা বলছেন, যেকারণে আওয়ামী লীগের এত দিনের যে অবস্থান, যে তারা বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় না, সেটি একভাবে ঠিক রেখেই আলোচনায় বসা যাচ্ছে, সেটি আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক স্বস্তি।
একই সঙ্গে তারা এও মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও হয়তো চাপ রয়েছে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যপারে।
কারণ, বিএনপিকে ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মতো আরেকটি নির্বাচন হলে সেটি হয়ত আন্তর্জাতিক মহল মেনে নেবে না, যা আওয়ামী লীগের জন্য একটি চাপ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হয়তো একটা চাপ আছে, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই বলেছে যে তারা নির্বাচনে কোনো অবজারভার পাঠাবে না। কোনো কারণ বলেনি, কিন্তু এটা একটা ইন্ডিকেশন।”
“২০১৪ সালের নির্বাচনটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মেনে নিয়েছিল, কারণ আওয়ামী লীগ সফলভাবে চিত্রায়িত করতে পেরেছিল যে বিএনপি একটা জঙ্গি দল। কিন্তু এখন গত পাঁচ বছরে দেশে ‘গভর্নেন্সের’ যে চেহারা! এজন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়—সেটা একটা চাপ হতে পারে,” বলেন তিনি।
সংলাপে বসার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে সক্ষম হবে বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ বলে এসেছে, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংবিধানে যা বলা আছে, সেটিই চূড়ান্ত। ফলে এ নিয়ে সংলাপের কোনো দরকার নেই।
এ মাসের মাঝামাঝি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এই জোট যখন তাদের সাত দফা ঘোষণা করে, তখনও আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছিলেন, এ নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।
ফলে দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশন যেদিন শেষ হলো, সেদিন সংলাপে সম্মতি জানিয়ে দলটির ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছিল খোদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও।
কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ মনে করেন, নিজের প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগ সংলাপে রাজি হয়েছে।
“এটা একটা কৌশল হতে পারে যে সবার সাথে আলাপ আলোচনা করার জন্য সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছে। আরেকটা কারণ হতে পারে যে, তারা হয়তো উপলব্ধি করেছেন, বর্তমান যে সংকট তা সংলাপ ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়।”
“একটা সমঝোতায় এসে যদি সবাই মিলে আমরা একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারি, সেটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে, তাদের জন্যও মঙ্গলজনক হবে।”
গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের যাত্রার সময় থেকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসনে সংলাপ বা আলোচনার আয়োজন দেখা গেছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফলাফল শূন্য হলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এবারের সংলাপে সমঝোতার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।